অপু-দুর্গার পুজো | কফি হাউসের আড্ডা

অপু-দুর্গার পুজো

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর 29, 2009 সময় :16:37
লেখক : মহাশ্বেতা

মহালয়ার ভোরবেলা অ্যালার্ম বাজিয়ে চারটের সময় ঘুম থেকে উঠে, ধূপ জ্বালিয়ে,  ল্যাপটপ খুলে মহিষাসুরমর্দিনীর সিডি চালিয়ে দিলাম। প্রত্যেক বছরের মতই ভাবলাম, এইবার পুরো অনুষ্ঠান শুরু থেকে শেষ অবধি শুনবো। আমার সিডি টা ভিডিও সিডি। তাতে  বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় যখন উদাত্ত স্বরে শোনা যায় “যা দেবি সর্ব্বভূতেষূ — ” তখন স্ক্রিনের ওপর পাটের চুল দাড়ি লাগানো বর্ষীয়ান অভিনেতা মনু মুখার্জীকে দেখা যায় চট দিয়ে তৈরি স্টুডিওর কুঁড়ে ঘরে বসে  সেই বজ্রগম্ভীর কন্ঠের লিপ দিচ্ছেন। মাঝে মাঝে নীল আকাশ, কাশ ফুল, দুর্গার মুখ, নৃত্যরতা মহিলা, লালপেড়ে শাড়ী পরা বাঙালিনী — আমার ভালো লাগে না। কিরকম যেন মনে হয় একটা অপার্থিব ঘটনাকে জোর করে টেনে নামিয়ে আনা হচ্ছে। ‘মহিসাষুরমর্দিনী’ দেখার নয়, শোনার, অনুভব করার —অন্ধকার ঘরে বালিশ আঁকড়ে বিছানায় শুয়ে নিজের অজান্তেই রোমাঞ্চিত হওয়ার — এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।

তাই আমি কোন দিনই সিডির ছবি অংশটুকু দেখিনা। ইদানীং রেডিওতেও শুনি না। কারণ সত্যি বলতে কি, আকাশবানীর সম্প্রচার এ কি হয় জানিনা,অনেকদিন শুনিনি, কিন্তু এফ এম চ্যানেল গুলি যা করে, সেট ক্ষমার অযোগ্য। আমি বার তিনেক শোনার চেষ্টা করেছি বিভিন্ন চ্যানেলে, সবাই এক! এক মন্দ্রগম্ভীর অনুষ্ঠান চলার মাঝখানে তারা বাধ্য করে তাদের নিজস্ব জিঙ্গল শুনতে, মাঝে মাঝে অন্যান্য বিজ্ঞাপনও থাকে। সে যে কি অসহ্য!! পন্যসংস্কৃতির যুগে ৩৬৫ x ২৪ ঘন্টার মধ্যে মাত্র দেড় ঘন্টাও তারা আমাদের ছাড় দিতে রাজি নয় ! তাই আমিও তাদের এই দেড় ঘন্টার জন্য ত্যাগ করেছি। ভাগ্যিস অনুষ্ঠানটির সিডি পাওয়া যায়। অন্তত নিজের মত করে, চোখ বুজে ডুবে যাওয়া যায় সঙ্গীত-কাব্য-চন্ডীপাঠের এক অনন্য অভিজ্ঞতায়।

এবারো শেষ পর্যন্ত পণরক্ষা হল না। খানিক্ষণ আলো জ্বেলে বসে থেকেই মনে হলো এত আলোতে ঠিক ব্যাপারটা জমছে না। তাই আলো নিভিয়ে ‘নম চন্ডী, নম চন্ডী —” শুনতে শুনতে শুয়ে পড়লাম আবার। আর তখনই হটাত করে মনে পড়ে গেল একটা নাম আর একটা ছবি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ছায়াছবি নিয়ে অনেক রকমের থিওরি পড়তে হয়েছিল। তার মধ্যে একজন ছিলেন সিগফ্রিড ক্রাকোয়া (Siegfried Kracauer ). তাঁর  “Theory of Film:Redemption of Physical Reality” বইয়ের শেষ পরিচ্ছেদে ‘অপরাজিত’ নিয়ে আলোচনা করে তিনি বলেছিলেন, ‘অপরাজিত’  এক সর্বকালীন ছবি। এই ছবিতে দূর শহরে পড়তে যাওয়া ছেলের ফিরে আসার জন্য মায়ের যে অপেক্ষা, আর অপরদিকে সদ্য বড় হওয়া ছেলের কাছে মায়ের টানের থেকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় অজানা, অদেখা নতুনের টান – এই টানাপোড়েন বিশ্বের সব মা আর সন্তানের গল্প। পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তেই ঘরে থাকা মা অপেক্ষা করে থাকে ছুটির দিনে তার সন্তানের ঘরে ফেরার দিকে তাকিয়ে, আর সব সন্তানই ফিরে আসে, কিন্তু কিছু সময় পরে আবার ফিরেও যায় নিজের নতুন ঠিকানায়।

লেখকের নাম টা অবশ্যি তক্ষুনি মনে পড়েনি, বরং আধো-ঘুমে আধো জাগরনে বৃটীশ কবি সিগফ্রিড সাসুনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে , এতদিন পরেও আমার নামটা মনে আছে- কি আশ্চর্য!! ভেবে আত্মতুষ্টিতে ঘূমিয়ে পড়লাম। আমার স্পিকারে তখন মহিষাসুরের সঙ্গে মা দুর্গার ভয়ানক যুদ্ধ চলছে। সেই  ঘনঘটাপূর্ণ সঙ্গীত এবং ভাষ্যকে পটভূমিকায় রেখে অপরাজিত, আমার বাড়ী ফেরা, অপরাজিত ছবির সেই শেষ  দৃশ্য, পুজো এইসব নানাবিধ ভাবতে ভাবতে তলিয়ে গেলাম নিবিড় ঘুমে।

কেন মনে পড়লো এই নাম এবং এই ছবি? আসলে যখন এই বইটা পড়েছিলাম, তখন থেকেই, মাঝে মাঝেই আমার মনে পড়েছে এই বইটার কথা, আর ‘অপরাজিত’র কথা। অপুর সঙ্গে আমার খুব মিল। শুধু আমার না, আমার ভাই, আমার পিসতুতো ভাই বোনেদের, আমার পাড়ার সাগর, সৈকত, টুপাই- সব্বার খুব মিল। কারণ আমরা সবাই  একেকজন অপু।  কর্মসূত্রে অথবা পড়াশোনার জন্য বাড়ী  থেকে দূ্রে থাকি। বেশিরভাগ কলকাতা, কেউ গুজরাত, কেউ অন্ধ্রপ্রদেশ, কেউ মুম্বই, কেউ বা আরো দূরে, কেউ একটু কাছে। বছরে দুই বা তিনবার বাড়ী আসি। অন্য সময়ে না পারলেও পুজোয় তো আসি-ই। আমাদের বাড়ী পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খন্ডের সীমানায় এক ছোট্ট  শিল্পাঞ্চলের কাছে। কলকাতা থেকে আসতে ঘন্টা পাঁচ-ছয় লাগে। কেউ বা আসে মহালয়ার পর পরই। কেউ ষষ্ঠীতে বা সপ্তমীতে, কেউ বা কলকাতার পুজো পরিক্রমা সেরে অষ্টমী বা নবমীতে। কেউ কেউ ফিরতে পারে না।

কলকাতার তুলনায় আমাদের এখানে পুজোগুলির জাঁকজমক অনেক কম। একটি বা দুটি পুজোর উদ্যোক্তারা চেষ্টা করেন কলকাতার অনুসরনে থিম পুজো করার, বাকিগুলি নিখাদ বারোয়ারি পুজো। মন্ডপসজ্জা, আলো, বা প্রতিমা, সবকিছুই এক নির্দিষ্ট গুণমানের। কিন্তু জাঁকজমক যতই কম থাক, উতসাহ আর উদ্দীপনার কমতি থাকে না একফোঁটাও। ভোর চারটে না বাজতেই সবার ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য বাজতে থাকে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ । আর সারাদিন ধরে সানাই, আর মাঝে মাঝে স্বাদবদলের হিন্দি-বাংলা গান। ছোটরা এবং বড়রা বয়স অনুসারে মন্ডপের ভিতরে-বাইরে বসে আড্ডায় মেতে ওঠেন। সন্ধ্যা হতে হতে দল বেঁধে ভিড় জমায় কাছে-দূরের বিভিন্ন বসতির মানুষ।অষ্টমীর অঞ্জলি দিতে বাড়ির গাছ থেকে ফুল পেড়ে নিয়ে যায় সবাই। নবমীর দুপুরে খিচুড়ী ভোগ।  একাদশীর সন্ধ্যায় বিজয়া সম্মিলনীতে নানা রকমের নাচ-গান। আমার মত ঘর ফেরা অপুদের আলাদা পাওনা হল এক বছর পরে বন্ধুবান্ধবদের সাথে দেখা হওয়া।

তাই বছরের পর বছর ধরে, পুজোর ঢাকে কাঠি পড়লেই, ব্যাগ-বাক্সের ধুলো ঝেড়ে, তার মধ্যে জামা-কাপড় আর উপহারের টুকিটাকি ভরে,  মহানগরের উৎসবের অমোঘ আকর্ষণ ত্যাগ করে   বাড়ি চলে আসি। মনে করে ব্যাগে ভরি বাবার পছন্দের মিষ্টির বাক্স, মায়ের জন্য আসল জার্মান হোমিওপ্যাথি ওষুধ, আর গোপালের জন্য লাল-নীল জরিপাড় বসানো নতুন জামা। আসার পথে রেল লাইনের ধারে কয়েকগুছি কাশফুল দেখতে পেলে মন আনচান করে ওঠে। কোথাও বা স্টেশনের ধারে রঙ্গিন মন্ডপের সামনে বেলুন হাতে দাদুর কোলে ছোট্ট শিশু; ট্রেনের কামরার ভেতর ছূটির ডাকে উন্মনা লটবহর শুদ্ধ ভ্রমণপিপাসু বাঙালি। ফেরিওয়ালার হাতে নতুন পূজাবার্ষিকী।

শেষ বিকেলে ট্রেন থেকে যখন নামি, আশ্বিনের গোধুলিতে গাছপালায় ছাওয়া আমাদের ছোট স্টেশনটাকে তখন বড় মায়াময় লাগে। আমি ভারি স্যুটকেস টেনে ওভারব্রীজ পেরোতে পেরোতে দেখি, ট্রেনটা কেমন বাঁক নিয়ে চলে যাচ্ছে আরো দূরে…আরো কত অপুকে পৌঁছে দিতে — হয়ত তাদের নিশ্চিন্দিপুরে — বা হয়তো কোন অজানার সন্ধানে — আর অপুর সাথে, এই ছুটির কটা দিনে,  চুপিচুপি  সঙ্গ নিয়েছে  -দুর্গা ।

ব্লগের অন্যান্য কিছু পোস্ট

আসছে…

  • Google Bookmarks
  • Orkut
  • Twitter
  • Facebook
  • Yahoo Bookmarks
  • Share/Bookmark

প্রকাশিত হয়েছে ব্লগাড্ডা বিভাগে || 201 বার দেখা হয়েছে

13 টি মন্তব্য “অপু-দুর্গার পুজো” সম্পর্কে :

  1. অপু-দুর্গার পুজো « Prism of Life – Mahasweta’s Weblog (পাঠক)

    [...] এই পোস্টটি একই সংগে ‘কফিহাউসেরআড্ডা‘তেও প্রকাশিত [...]

  2. মাল্যবান

    মহাশ্বেতা, কফিহাউসে স্বাগতম ।
    হৃদয়ছোঁয়া লেখা। যে অপুরা তাদের নিশ্চিন্দিপুরে ফিরতে পারল না তাদের মন ভারী হয়ে উঠবে। যেমন দিগন্ত-অভ্র এরা ।
    অনবদ্য ছবি তৈরী করেছ লেখায়। আরও পোস্টের অপেক্ষায় রইলাম ।

  3. অভ্র

    অপূর্ব লাগল লেখাটি, মনে করে দেখার চেষ্টা করছিলাম এক পুরনো দৃশ্য। কলেজে পড়ার সময় বাড়ি আসার সুযোগ ছিল খুব কম। থাকতাম জয়পুরে, সময়ও লাগত অনেক। কিন্তু স্টেশনে যোধপুর-হাওড়া ট্রেনটাকে ঢুকতে দেখলেই মনে মনে বাড়ি পৌঁছে যেতাম, আপনার লেখা পড়ে ঠিক সেই দৃশ্যটি যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল।

  4. মহাশ্বেতা

    ধন্যবাদ, মাল্যবান দা এবং অভ্র। চেষ্টা করবো নিয়মিত লিখতে।

  5. মডারেটর

    আপনাকে স্বাগত নতুন ব্লগ-আড্ডায়। কোনোরকম অসুবিধার কথা কিন্তু জানাতে ভুলবেন না। ব্লগে আরো কিছু চাই মনে হলে তাও জানাবেন।

  6. অতনু

    চমতকার লেখা…

  7. মহাশ্বেতা (পাঠক)

    ধন্যবাদ অতনু।

  8. হাসান

    বাহ চমৎকার লাগল। “শেষ বিকেলে ট্রেন থেকে যখন নামি, আশ্বিনের গোধুলিতে গাছপালায় ছাওয়া আমাদের ছোট স্টেশনটাকে তখন বড় মায়াময় লাগে” – ছবিটা দেখতে পেলুম।

  9. অপরাজিত

    আমরা সবাই একেকজন অপু।

  10. nita

    আপনি খুব সুন্দর লেখেন!

মন্তব্য করুন

  (To Type in English, deselect the checkbox. Tips : click on the word and choose from the menu if the word displayed is not correct.)

মন্তব্য যেমন দেখা যাবে :

লেখা ছোটো দেখাচ্ছে?

সাবস্ক্রাইব করুন

Subscribe

সাম্প্রতিক মন্তব্য

  • অভ্র: সুশান্ত’দা, আপনার ভাল লেগেছে জেনে খুব খুশি...
  • অভ্র: বাবিয়াপিসি, তুমি কবিতাটা পড়েছ দেখে খুব ভাল লাগল।...
  • অভ্র: চমৎকার হয়েছে
  • অভ্র: ভাল হয়েছে। মিলাদ শব্দটির অর্থ জানালে খুশি হব।
  • অভ্র: রনি সুন্দর লিখেছেন কবিতাটি। ভাল লাগল। কিন্তু কয়েক...
  • অভ্র: আমি ভিডিওটা জুড়ে দিলাম। httpv://www.youtube.c...
  • অভ্র: ইস, এখানে তো আর দেখতে পাব না। তবে গানটা শুনলাম, খুব...
  • অভ্র: আমি তো আগেই পড়েছি আপনার ব্লগে। কফিহাউসে পোস্ট...
  • পাগলাবাবু: আমারও ভালো লাগলো ”ঘূর্ণি ঝড়” । আরও...
  • নীল নক্ষত্র: ঘূর্ণি ঝড় কবিতা পড়ে আমার সেই দিনের কথা মনে...
Lingual Support by India Fascinates