ভারতের প্রথম জাতীয় কবি– “তুতি-এ-হিন্দ– আমীর খসরু” ও তার প্রেক্ষাপট (পর্ব-২) | কফি হাউসের আড্ডা

ভারতের প্রথম জাতীয় কবি– “তুতি-এ-হিন্দ– আমীর খসরু” ও তার প্রেক্ষাপট (পর্ব-২)

শনিবার, জুলাই 31, 2010 সময় :20:52
লেখক : রনি কোলকাতা

ঠিক এমনিই আর একটি ঢেউ উঠেছিল সপ্তম শতকে ইসলামী সভ্যতার উথ্বান এবং বিকাশের মধ্য দিয়ে। মরুময় আরব ভূমি থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল তদানীন্তন সময়ে পরিচিত ভৌগোলিক পরিসীমার আনাচে কানাচে। কোথাও প্রত্যক্ষভাবে, আবার কোথাও পরোক্ষভাবে। সমগ্র পশ্চিম এশিয়া, মধ্য এশিয়া, দক্ষিন পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের দক্ষিন অংশের গ্রিস, বর্তমান রাশিয়া, আলবেনিয়া, তুরস্কের ইউরোপীয় অংশ সহ ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার ছোট বড় দ্বীপের উপরে আসে প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ। আরবদের ভাষা সংস্কৃতি পায় আন্তর্জাতিক গুরুত্ব।

মজার ব্যাপার হল ইসলাম কতৃক প্রজ্বলিত ভাষা সাহিত্য শিল্প বিজ্ঞান সংস্কৃতির আলোকে আলোকিত পারস্য সাম্রাজ্য ইসলাম এবং ইসলামের যা কিছু ভাল তা অকুণ্ঠ চিত্তে গ্রহন করল এবং সমৃদ্ধতর এক জাতিতে রূপান্তরিত হল। কিন্তু এই রূপান্তর অন্যদের মতো এক পাক্ষিক হল না। এমনিতেই বিশাল পারস্য সাম্রাজ্য নিজস্ব সভ্যতাও সংস্কৃতিতে উজ্জ্বল ছিল। তার অভিমানও ছিল তাদের চিত্তে। ইসলামী ধর্ম সংস্কৃতিকে বরন করে নেবার পরেও স্বকীয় প্রক্রিয়ায় আরবী ভাষা সংস্কৃতিকে আহিত করেছিল পারস্য ভাষা সাহিত্য শৈল্পিক সম্পদ দিয়ে। এটা গাঢ়তর রূপ লাভ করেছিল আরববাসীর খেলাফত আমলে ৮১১ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা মামুনের রাজধানী সিরিয়ার দামাস্কাস থেকে বাগদাদে স্থানান্তরের পর থেকে। সমগ্র মধ্য এশিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ সহ দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল ইসলাম বাহিত পারস্য ভাষা সাহিত্য শিল্প। মধ্য এশিয়ায় যে স্পেনের কর্ডোভার মতই সমরখন্দ বুখারায় বৌদ্ধিক চর্চার কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছিল সেখানেও রাজধানী স্থানান্তরের কিছু প্রভাব অবশ্যই ছিল। ভাবলে অবাক হতে হয় গনিত বিদ্যা, চিকিৎসা বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞানের যে নতুন নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছিল—তার শুরু এখান থেকেই। উচ্চমানের অবজারভেটরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মহাকাশ গবেষণার জন্য। আবুসিনার মতো বিশ্ববিশ্রুত চিকিৎসক এবং দার্শনিক কবির বিচরন ভূমি ছিল এই সমস্ত এলাকা।

ভারতীয় সংস্কৃতির বিবর্তনে রাজধানীর স্থানন্তরের প্রভাব অত্যন্ত গভীর এবং সুদূর প্রসারী। ভারতে ইসলামী সভ্যতার প্রচার এবং প্রসারের ভাবনাটি ইসলামের জন্মের অব্যবহিত পরেই। দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রঃ) ৬৩৬-৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম প্রচেষ্টা চালান কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। পরে চতুর্থ খলিফা হযরত আলীর সময়েও উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং তা পরিত্যক্ত হয়। এ ব্যাপারে প্রথম সাফল্য আসে ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে। ইসলামী সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলীয় শাসক হাজ্জাজ-বিন-ইউসুফের উদ্যোগে তারই জামাতা মহন্মদ-বিন-কাশিমের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযান এই সাফল্য এনে দেয়। সিন্ধুর রাজা দাহিরের পতনের মাধ্যমে ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরী হয়। যদিও ঐতিহাসিক নেলপুন তাকে Triumph without result বলে মন্তব্য করেছেন। মন্তব্যটি অবশ্যই বিতর্কের উর্দ্ধে নয়।

পরবর্তী অভিযানকারী গজনীর সুলতান মামুদ। মহন্মদ-বিন-কাশিমের অভিযানের ২৮৮ বছর পর তার অভিযান এবং শুধু একবার বা দু বার নয়। তার জীবদ্দশায় (মৃত্যু-১০২৬) ১৭ বার ভারতে ঝড়ের বেগে প্রবেশ করেন। স্থায়ী কোন সাম্রাজ্যের বিস্তার তার লক্ষ্য ছিল না। শুধুমাত্র ধনসম্পদকে হস্তগত করা এবং তা দিয়ে গজনী কে সম্পদে ঐশ্বর্যে এবং হর্ম্য প্রাসাদে সুসজ্জিত করে তোলা। সে কারনেই তিনি সব চাইতে নিন্দিত আক্রমণ কারীদের মধ্যে অন্যতম বলে চিহ্নিত। তবে তার চরিত্রের আরও একটা দিক আছে যার জন্য তিনি নন্দিত হবার দাবি করতেই পারেন, সেটা হল নিবন্ধের লক্ষ্য মান বিষয়। ভারতীয় সংস্কৃতিতে আরব এবং পারস্য সংস্কৃতির মিলন এবং পরবর্তী সময়ে সংস্কৃতি চর্চায় তার ভূমিকা। এক্ষেত্রে সুলতান মামুদের এদিকটাও আলোচনার দাবি রাখে।

সমরখন্দ বুখারার প্রতিবেশী খোয়ারিজ দখলের পর ধন সম্পদের সঙ্গে তার চোখ যায় আবু রাইহান আল বিরুনী, আব্দুল খায়ের আল হুসেন বিন খন্মার আল বাগদাদী এবং আবু সহল ঈশা বিন ইয়াইয়া আল মসিহীর মত লব্ধ প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক বিজ্ঞানী চিকিৎসকের উপর। তাদের তিনি গজনীতে এনে বসবাস করতে বাধ্য করেন। ভারত অভিযানের সময় এই সব পণ্ডিতদের কাউকে কাউকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত এই মানুষটি তাদের চলাফেরার উপর সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। তার সময় ভারতবর্ষ থেকেও বহু পণ্ডিতদের গজনীতে নিয়ে গিয়ে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। যাকে অতি গোঁড়া বলে সমালোচনা করা হয়। তার দরবারেই ভারতীয় হিন্দু পণ্ডিত ছাড়াও খ্রীষ্টান পণ্ডিতদেরও সমাদর করা হতো। আল বিরুনীর সঙ্গে আনীত আবুল খায়ের এবং আবু সহল ধর্ম বিশ্বাসে দুজনেই খ্রীষ্টান ছিলেন।

চলবে——

তথ্যসুত্রঃ-
১) পারস্য সাহিত্য পরিক্রমা— পার্বতীচরন ভট্টাচার্য।
২) আমীর খশরুর দীওয়ান—অনুবাদ—হাবিব আহসান
৩) ভারতের মুসলিম সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ –এম কে জওহর
৪) সংস্কৃতির সমন্বয় কিছু ভাবনা — ডঃ রেজাউল করীম
৫) ওমর খৈয়াম – অনুবাদ – সুরেশ চন্দ্রনন্দী
৬) ইংরেজী সাহিত্যের ইতিহাস – কুন্তল চট্টোপাধ্যায়
৭) আধুনিক ইংল্যান্ড – টিউডড় যুগ – অধ্যাপক গোপাল চন্দ্র সিনহা
৮) ভাস্কো ডা গামার পাচশ বছর – সুরজিৎ দাস
৯) আল বিরুণীর ভারত তত্ত্ব – অনুবাদ—বাংলা একাডেমি (ঢাকা)

ব্লগের অন্যান্য কিছু পোস্ট

আসছে…

  • Google Bookmarks
  • Orkut
  • Twitter
  • Facebook
  • Yahoo Bookmarks
  • Share/Bookmark

প্রকাশিত হয়েছে প্রবন্ধ বিভাগে || 69 বার দেখা হয়েছে

2 টি মন্তব্য “ভারতের প্রথম জাতীয় কবি– “তুতি-এ-হিন্দ– আমীর খসরু” ও তার প্রেক্ষাপট (পর্ব-২)” সম্পর্কে :

  1. অর্ণব দত্ত

    খুব সুন্দর হয়েছে। তবে বানানগুলির দিকে নজর রাখলে ভাল হত। যেমন, উথ্বান নয় উত্থান, দক্ষিন নয় দক্ষিণ, টিউডড় নয় টিউডর ইত্যাদি।

  2. নিতা

    চলুক… :)

মন্তব্য করুন

  (To Type in English, deselect the checkbox. Tips : click on the word and choose from the menu if the word displayed is not correct.)

মন্তব্য যেমন দেখা যাবে :

লেখা ছোটো দেখাচ্ছে?

সাবস্ক্রাইব করুন

Subscribe

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Lingual Support by India Fascinates